Bijoy Ministries

পূর্ণ-বয়স্কতার অংশ হিসেবে বিয়ে

একটি সুস্থ ও কার্যকর সমাজ গড়ার জন্য স্থিতিশীল বিয়ে এবং পরিবার-প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য।
সুস্থ বিয়ে ও পারিবারিক জীবনের ভিত্তি না থাকলে কোনো সমাজই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।|
প্রাপ্তবয়স্কতা শুধু বয়সের বিষয় নয়, এটি একটি অর্জন।
ইতিহাস জুড়ে তরুণরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে এবং সেটি অর্জনের জন্য চেষ্টা করেছে। সমাজে প্রাপ্তবয়স্কতার তিনটি প্রায় সার্বজনীন চিহ্ন হলো—বিয়ে করা, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া এবং সন্তানধারণের জন্য প্রস্তুত থাকা।
কিন্তু বর্তমানে এই প্রাপ্তবয়স্কতার ধারণাই সংকটের মুখে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের তরুণরা আগের প্রজন্মের তুলনায় বেশ দেরিতে প্রাপ্তবয়স্ক হচ্ছেন। ২০০৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিয়ের প্রবণতা বেশ বড় সংখ্যার।

এটা আমাদের সবার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

কারণ একটি সুস্থ ও কার্যকর সমাজের জন্য স্থিতিশীল বিয়ে ও পরিবার গড়া প্রয়োজন। সুস্থ বিয়ে ও পারিবারিক জীবনের ভিত্তি ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

কোন সমাজে বিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার পরিণতি যেমন স্পষ্ট, তেমনি অল্প বয়সে বিয়ের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হালকা ভাবে নেওয়াটাও ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য বেশ ক্ষতিকর।

আমেরিকাসহ অনেক ইউরোপীয় দেশে প্রাপ্তবয়স্করা দেরিতে বিয়ের প্রবণতা দেখা দিলেও, বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম।

আইসিডিডিআর,বি-এর গবেষণা (২০২২–২০২৪) বলছে,

    • শহরের বস্তিতে ১৮ বছরের আগে বিয়ে করে ৬৫% নারী, যা গ্রামের (৪৩%) চেয়েও বেশি।
    • পোশাক শ্রমিকদের মধ্যে ৬৫% নারী ১৮ বছরের আগেই বিয়ে করেন এবং একই বয়সের আগেই গর্ভবতী হন।
    • পুরুষদের ক্ষেত্রেও ২১ বছরের আগে বিয়ের হার বস্তিতে ৩৭%, যা গ্রামের (১৫%) তুলনায় অনেক বেশি।
    • বিয়ের এক বছরের মধ্যেই ৭৩% নারী গর্ভবতী হচ্ছেন।
    • বিয়ের পর ৬০-৬৬% মেয়ের শিক্ষাজীবন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
    • সর্বনিম্ন আয়ের পরিবারের ৮১% মেয়ে ১৮ বছরের আগে বিয়ে করে।

এই প্রবণতা: কী বোঝাচ্ছে?

    • অল্প বয়সে বিয়ে শুধু গ্রামে নয়শহরের বস্তিতেও আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
      • অর্থাৎ, দারিদ্র্য যেখানে বেশি, সেখানেই অকাল বিয়ের হারও বেশি — এটি একটি স্পষ্ট প্রবণতা।
    • শিক্ষার অভাব এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
      • বিয়ে মানেই প্রায় ক্ষেত্রেই তাড়াতাড়ি গর্ভধারণ, যা কিশোরী মায়েদের শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
      • বিয়ে করার পর মেয়েদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, যা দারিদ্র্যের চক্রকে আরও ঘোরালো করছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে,

অল্প বয়সে বিয়ে ও সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা শুধু বেড়েই চলেছে। দারিদ্র্য ও অশিক্ষা এই প্রবণতার মূল চালিকাশক্তি, আর এর পরিণতি হচ্ছে—অকাল গর্ভধারণ, শিক্ষাজীবন শেষ, সহিংসতা এবং দারিদ্র্যের পুনরাবৃত্তি।

কিন্তু খ্রীষ্টিয়ানদের কাছে এই বিষয়টি শুধু সমাজতাত্ত্বিক বা অর্থনৈতিক বিষয় নয়।

মূল সমস্যা হলো নৈতিকতা।

আমরা যখন নৈতিকতার কথা ভাবি, তখন সাধারণত নিয়মকানুন বা আদেশ-নিষেধের কথা মনে পড়ে। কিন্তু খ্রীষ্টিয়ান দৃষ্টিভঙ্গি বলে, নৈতিকতার প্রথম প্রশ্ন হলো—ঈশ্বর তাঁর সৃষ্ট মানুষ হিসেবে আমাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করেন, বিশেষ করে যারা তাঁর নিজের প্রতিমূর্তিতে সৃষ্টি হয়েছে।

অবিবাহিত অবস্থায় শারিরীক সম্পর্ক বিয়ে প্রতিস্থাপন করছে

বাইবেল বিয়েকে মানবজাতির জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রত্যাশা হিসেবে ঘোষণা করে।

বাইবেল বলে,

“এজন্য মানুষ তার পিতা-মাতাকে ছেড়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত হবে এবং তারা দুজন এক দেহ হবে” (আদিপুস্তক ২:২৪)।

কিন্তু এই বাস্তবতা দিনদিন বিরল হয়ে যাচ্ছে।

বর্তমান সমাজে বিয়ে ছাড়া সহবাস ক্রমেই সাধারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরাও বলছেন যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবিবাহিত সহবাস আর বিয়েতে পরিণত হয় না।

বিয়ের আগে দৈহিক সম্পর্ক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বল্পকালীন। এটি বিয়ের আগে সহবাস নয়, বরং বিয়ের বদলে সহবাসে পরিণত হয়েছে।

খ্রীষ্টে বিশ্বাসীরা বোঝেন যে, পুরুষ ও নারী হিসেবে আমরা ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশের জন্য সৃষ্টি হয়েছি এবং যৌনতা ও সন্তান জন্মদানের জন্য ঈশ্বর বিয়েকেই একমাত্র উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

আমাদের বোঝা উচিত যে, আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে তা ভালোবাসার মোড়কে লালসা ছাড়া আর কিছুই না। কিশোর বয়সে সম্পর্কে জড়াবার প্রবণতা চিরকালিন কিন্তু সচেতন খ্রীষ্টিয়ান হিসাবে আমাদেরকে সংযত করতে শিখতে হবে। প্রতিদিন অসংখ্য সংবাদ (সামাজিক মাধ্যমের তথ্য) আমাদের যুব ও কিশোর বয়সকে প্রভাবিত করছে, কিন্তু বাইবেলীয় শিক্ষা ‍ ও পারিবারিক মূল্যবোধ যেন আমরা প্রচলিত ধারার সাথে সমঝোতা না করি।

দেরিতে বিয়ে করা যেমন অনুপোযুক্ত ঠিক তেমনি অল্প বয়সেও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়াও শারিরীক ও মানসিক ভাবে ক্ষতিকর। বরং সময়টাকে কাজে লাগিয়ে প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি হয়ে উঠা, নিজের ও অপরের দায়িত্ব নিতে সক্ষমতা অর্জন করা উপযুক্ত।

একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য হলো তিনি,

১. নিজের-দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন

    • নিজের আবেগ, আচরণ, সিদ্ধান্ত ও ভুলের দায়িত্ব নিজে নেয়।
    • অন্যকে দোষ দেয় না বা নিজের সমস্যার জন্য সঙ্গীকে দায়ী করে না।
    • “আমাকে সুখী করো” না ভেবে নিজের সুখ নিজে তৈরি করতে জানে।

২. আবেগীয় স্থিতিশীলতা রয়েছে

    • রাগ, হতাশা বা দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
    • আবেগের বশবর্তী হয়ে বড় সিদ্ধান্ত নেয় না।
    • একা থাকলেও ভেঙে পড়ে না; নিজের মানসিক যত্ন নিতে জানে।

৩. সঙ্গীর স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করেন

    • সঙ্গীকে নিজের “কপি” বা “প্রতিফলন” মনে করে না।
    • তার আলাদা চিন্তা, পছন্দ, স্বপ্ন ও সীমাবদ্ধতা আছে—এটা মেনে নেয়।
    • সঙ্গীকে বদলানোর চেষ্টা না করে বুঝতে শেখে।

৪. ভালোবাসাকে “দেওয়া” হিসেবে দেখে, “নেওয়া” নয়

    • সম্পর্ক থেকে শুধু নেওয়ার প্রত্যাশা রাখে না।
    • ভেতরে সুস্থতা থাকায় উদ্বৃত্ত থেকে ভালোবাসা দিতে পারে।
    • ভালোবাসাকে লেনদেন বা বাধ্যবাধকতা মনে করে না।

৫. সঙ্গীর স্বাধীনতাকে সম্মান করে

    • সঙ্গীর ব্যক্তিগত সময়, বন্ধু, শখ ও জায়গাকে গুরুত্ব দেয়।
    • নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না; বিশ্বাস ও সম্মানের সম্পর্ক গড়ে।
    • যেখানে স্বাধীনতা নেই, সেখানে ভালোবাসা দমবন্ধ হয়ে যায়—এটা বোঝে।

৬. সংযুক্তি ও স্বাধীনতার ভারসাম্য রাখতে পারে

    • গভীরভাবে সংযুক্ত থাকে, কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্ব হারায় না।
    • “আমরা” আছি, কিন্তু “আমি”ও আছি—এই ভারসাম্য বজায় রাখে।
    • অতিরিক্ত দূরত্ব বা অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা—দুটোই এড়িয়ে চলে।

৭. নিজের শূন্যতা পূরণের জন্য সম্পর্ক ব্যবহার করে না

    • সঙ্গীকে নিজের “উদ্ধারকারী” বা “কেয়ারটেকার” ভাবে না।
    • নিজের আত্মিক, মানসিক ও ব্যক্তিগত বিকাশে সচেষ্ট থাকে।
    • সম্পর্ককে “প্রয়োজন” নয়, “সিদ্ধান্ত” হিসেবে দেখে।

৮. সহমর্মিতা (Empathy) ও শোনার দক্ষতা রয়েছে

    • শুধু নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না; সঙ্গীর অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করে।
    • সঙ্গী যা বলছে, তা মন দিয়ে শোনে এবং গুরুত্ব দেয়।
    • “সে কেন এমন অনুভব করছে?”—এই প্রশ্নটি নিজেকে করে।

৯. পারিবারিক সীমারেখা তৈরি করতে পারে

    • বাবা-মা বা আত্মীয়দের ভালোবাসে, কিন্তু নতুন পরিবারকে অগ্রাধিকার দেয়।
    • বাবা-মায়ের ঘর মানসিকভাবে ছেড়ে নিজের সংসার গড়তে সক্ষম।
    • “আমার পরিবার হলো আমার স্ত্রী/স্বামী ও সন্তান”—এই ধারণা বুঝতে পারে

১০. ঈশ্বরকে দাম্পত্যের কেন্দ্রে রাখে

    • সম্পর্ককে “আমার পথ বনাম তোমার পথ” না ভেবে “ঈশ্বরের পথ” হিসেবে দেখেন
    • একসঙ্গে প্রার্থনা, বাইবেল পড়া ও উপাসনা করে।
    • বুঝে যে দাম্পত্য প্রভুর উপাসনাকে প্রতিফলিত করে

১১. ইচ্ছাকৃতভাবে সম্পর্ক গড়তে কাজ করে

    • সুযোগের অপেক্ষা না করে সময় বের করে নেয়।
    • ছোট ছোট ভালোবাসার কাজ, কথা বলা, স্পর্শ—এসবকে গুরুত্ব দেয়।
    • সম্পর্ককে ভাগ্যের উপর না ছেড়ে সচেতনভাবে তৈরি করে

১২. ভুল স্বীকার করতে ও ক্ষমা চাইতে পারে

    • অহংকার বড় বাধা নয়; ভুল হলে তা স্বীকার করে
    • ক্ষমা চাইতে ও ক্ষমা দিতে জানে
    • সঙ্গীকে শত্রু না ভেবে, পড়ে গেলে হাত ধরে তোলে

১৩. সঙ্গীর স্বপ্ন ও উদ্দেশ্যকে সমর্থন করে

    • সঙ্গীর ক্যারিয়ার, আগ্রহ বা আহ্বানকে উৎসাহিত করে
    • তাকে “আমার জন্য” না দেখে “তার নিজস্ব পরিচয়” হিসেবে দেখে
    • একসঙ্গে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরি করে

১৪. দাম্পত্যকে “অংশীদারিত্ব” হিসেবে দেখে

    • “ক্ষমতার লড়াই” না করে “টিমওয়ার্ক”-এ বিশ্বাস করে
    • কাজ, সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব ভাগ করে নেয়
    • বোঝে যে দুজন একজনের চেয়ে ভালো—যখন তারা একসঙ্গে কাজ করে

১৫. আত্মিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে

    • বিয়ে করার আগে নিজেকে প্রস্তুত করে; শুধু “সঠিক মানুষ” খোঁজে না।
    • নিজের ভেতরের শূন্যতা নিয়ে কাজ করে।
    • পরিপূর্ণতা সম্পর্ক থেকে আসে না—তিনি নিজে থেকেই পরিপূর্ণ হতে চায়

ঈশ্বরের আরও উত্তম পরিকল্পনা আছে

ঝটপট সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া বা রাতারাতি বিয়ে করা বাইবেলের জীবনদৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিয়ে একটি সারা জীবনের সিদ্ধান্ত, আর সে িসদ্ধান্ত পরিপক্ক ভাবেই হওয়া উচিত। এর জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন।

যখন স্বামী-স্ত্রী বা ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে পূর্ণবয়স্ক হয়ে ওঠেন, তখন তারা বিভ্রান্ত বিশ্বের কাছে ঈশ্বরের পরিকল্পনা ও দানের সাক্ষী হয়ে ওঠেন। চঞ্চল ও অস্থির পৃথিবীর কাছে খ্রীষ্টে বিশ্বাসী হিসাবে এ বিষয়ে আমাদের সাক্ষ্য বহনের দারুন সুযোগ রয়েছে।  

যখন প্রতিবেশি, সহপাঠি বা বন্ধু-বান্ধবেরা অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্কে জড়াচ্ছে তখন আপনি বোঝেন যে, বিয়ের আগে বা বিয়ের বাইরে যৌনতা কোনো বিকল্প নয়। বিবাহ সম্পর্কের বাইরে সহবাস খ্রীষ্টিয় মূল্যবোধের পরিপন্থী।

সমাজ তখনই ভঙ্গুর হয়, যখন পরিবার কাঠামো দূর্বল হয়। পরিবার গঠন করতে পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তিতে নিজেকে পরিণত করে তুলুন, যোগ্য হয়ে উঠুন।

মণ্ডলীগুলির উচিত তরুণ-তরুণীদেরকে এ বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষন দেওয়া যেন জীবনের প্রতিটি স্তরে পবিত্রতা ও প্রভুর প্রতি আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তারা স্পষ্ট হয়।

যখন চারপাশের সমাজ বিভ্রান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে—‘কী তো বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেণ্ড নেই?’

তখন বিশ্বাসীদের উচিত পূর্ণ যোগ্যতায় সঠিক ব্যক্তি হয়ে, উপযুক্ত সময়ে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে প্রভুর দেওয়া সবকিছুর মাধ্যমে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ করা।

এই কাজে আমাদের গরিমসি করার সুযোগ নেই।

Scroll to Top